বিসিএস কি, কেন এবং কিভাবে প্রিপারেশন শুরু করব?

Share on facebook
Share on twitter
Share on pocket
Share on email
Share on print

সবাই তো জীবিকার পিছনে ছুটে, জীবনের পিছনে ছুটে কয়জন?” খুব পছন্দের একটি উক্তি। জীবনের জন্য জীবিকা, জীবিকার জন্য জীবন নয়, কিন্তু জীবিকার অন্বেষণে যদি জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে যায়? অথবা যে জীবিকার জন্য এত পরিশ্রম তা যদি পরিবারের আপনজনদের নিয়ে ব্যয় করতে নাই পারলেন, তাহলে সেই জীবিকার মূল্য কতখানি? তাহলে কোন চাকুরীতে আপনি জীবন ও জীবিকা এক সাথে পাবেন?

তবু জীবনের জন্য মাঝে মাঝে থামতে হয়।
কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে চাকুরী অনিশ্চিত, নেই কোন নির্দিষ্ট কর্ম ঘণ্টা, নেই কোন ফুরসত। অন্য প্রান্তে সম্মনা, নিশ্চিত চাকুরী ও ভবিষ্যৎ এর পাশাপাশি নানাবিধ সুবিধা (লিয়েন, প্রেষণ, শিক্ষা ছুটি) সিভিল সার্ভিস এর চাকুরী সমূহকে আরাধ্য করে তুলেছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বি সি এস এ মোট ২৭টি ক্যাডার এ বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্য থেকে জনবল নিয়োগ করা হয়। বি সি এস এর মাধ্যমে প্রথম শ্রেণীর গেজেটভুক্ত কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হন। প্রজাতন্ত্রের এই কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রদানের কাজটি করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। ব্রিটিশ পাবলিক সার্ভিস, পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস এর পরিনত রূপ হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস। নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ সম্মানের এই চাকুরী। কিন্তু প্রতিযোগিতা অন্য যেকোনো চাকুরীর তুলনায় অনেক বেশি, তাই পরিশ্রম, ধৈর্য এবং একাগ্রতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র অপরিহার্য।

বিসিএস এ প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক এই তিন ধাপে নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন হয়। বিসিএস এর যেকোনো ব্যাচ এর বিজ্ঞপ্তি থেকে নিয়োগ পর্যন্ত কম বেশি ২ বছর লেগে যায়, তাই পুরো সময়টাতে যথেষ্ট মানসিক শক্তি না থাকলে, ভেঙ্গে পরার সম্ভাবনা থাকে। নিজেকে সাপোর্ট দিতে হবে নিজেকেই, বিসিএস এর জন্য আপনার একাগ্রতা, একান্ত ইচ্ছাই পারে আপনাকে এগিয়ে নিতে। তাই বিসিএস এর জন্য চেষ্টা করার আগে জেনে নিন, এই পেশা কেন আপনি বেছে নিতে চাচ্ছেন।

সম্প্রতি বেতন ভাতা বৃদ্ধির কারণে সরকারী চাকুরীর বেতন অনেক বেসরকারি চাকুরীর চেয়ে বেশি। কিন্তু সামগ্রিক বেতন কাঠামোর জন্য সরকারী চাকুরী উপযুক্ত উপায় না, শুরুতে ভাল বেতন হলেও বৃদ্ধির হার কম এবং সরকারী চাকুরীতে আপনার বেতন সব সময় অপুষ্টিতে ভুগবে। কিন্তু পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এর সুবিধা আছে। আছে চাকুরীর নিরাপত্তা। অনেকে সম্মানের কথা ভাবতে পারেন, নিঃসন্দেহে বিসিএস কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে থাকেন। সবচেয়ে বড় বিষয়- দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পাওয়া। সরকারের নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের, জনগনের কল্যাণে সরাসরি ভূমিকা রাখা। আর সবচেয়ে ভাল সুযোগটি পেতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে, সবচেয়ে বেশি সময় দিতে অবশ্যই আপনি রাজি হবেন।

যেকোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে পরীক্ষার সম্ভাব্য সময় সেপ্টেম্বর মাসে। পরীক্ষার আগে ৩ মাস সময় হাতে নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহন করুন প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য। অনেকে বার বার প্রিলি দেন প্রস্তুতি ছাড়া, চান্স নিয়ে দেখেন, যদি লেগে যায়, তাহলে লিখিততে প্রস্তুতি নিবেন এই চিন্তা করে। কিন্তু বিসিএস এর প্রিলি উৎরানো লিখিত বা মৌখিক এর চেয়েও বেশি কঠিন। মনে রাখবেন-“প্রস্তুতি ছাড়া প্রিলি উৎরানো সম্ভব না”, নতুন ২০০নম্বর এর পদ্ধতিতে প্রস্তুতি নিতে হবে সব বিষয়ে। প্রস্তুতি ছাড়া প্রিলি দেয়ার পরে প্রিলি না হওয়া মানে পুরো এক বছর পিছিয়ে যাওয়া।

বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ এবং বিশেষভাবে আধুনিক যুগ পরতে হবে। সন্ধি, শব্দ, উপসর্গ, কারক, সমাস, অব্যয়, প্রত্যয় গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রস্তুতিটি লিখিত পরীক্ষাতেও কাজে লাগবে। চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, রামায়ন, মহাভারত, আরাকান রাজসভা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত উপন্যাস, গল্প, নাটক ইত্যাদি। উপাধি, ছদ্মনাম, উক্তি পড়তে হবে।

ইংরেজি সাহিত্যে এলিজাবেথ, ভিক্টোরিয়ান এবং রোমান্টিক এজ এর কবিদের সম্পর্কে পরলেই চলবে। কোন উক্তি কথা হতে উদ্ধৃত তা জানতে হবে, জানতে হবে কার উপাধি কি। ক্লজ, সেন্টেন্স স্ট্রাকচার, ভয়েস, ইডিওমস পরবেন।

বাংলাদেশ বিষয়ে পরতে শুরু করতে হবে বাঙালি জাতির উদ্ভব থেকে, তারপর ইতিহাস এ মৌর্য, তাম্র, পাল, সেন, আফগান, মুঘল, ইসলামী শাসন, সুলতানি আমল, নবাবি, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি আমল সব পরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভালভাবে জানতে হবে। সংবিধান, ভূপ্রকৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো, আকার আয়তন, প্রসিদ্ধ স্থান, নদীর গতি প্রকৃতি পরতে হবে। জানতে হবে আমাদের দেশে দুর্যোগ এর করনীয় এবং দুর্যোগ সম্পর্কিত ইতিহাস।

সুশাসন এর প্রশ্ন সমূহ কিছুটা সাধারন বিচক্ষণতা থেকেই উত্তর করা সম্ভব। তবু যেকোনো একটি বই থেকে দেখে নিতে পারেন। আন্তর্জাতিক এ দেখবেন বিভিন্ন সংস্থার প্রধান কার্যালয়, ইতিহাস, চুক্তি-বিভক্তি, যুদ্ধ, জলবায়ু সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইন, কনভেনশন, প্রোটোকল ইত্যাদি।

গনিত এর জন্য শতকরা, লাভ ক্ষতি, ঐকিক নিয়ম, বীজগণিতের রাশিমালা, মান নির্ণয়, সম্ভাব্যতা, বিন্যাস সমাবেশ, আয়তন, পরিসীমা সম্পর্কিত অথবা কোণের মান নির্ণয় ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করতে হবে। মানসিক দক্ষতার ক্ষেত্রে সাধারণত ধারা, সমার্থক শব্দ, এমনকি বানান আসতে পারে। তবে গানিতিক সমস্যা আর মানসিক দক্ষতার ক্ষেত্রে যাতে যথা সম্ভব কম সময়ে উত্তর করা সম্ভব হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিজ্ঞানে পদার্থ, রসায়ন এবং জীব বিজ্ঞান- সব শাখা থেকেই কিছু না কিছু আসে। বিভিন্ন পরিমাপ যন্ত্র, উদ্ভিদের বৃদ্ধি সম্পর্কিত তথ্য, শারীরবিদ্যা, মহাকর্ষ, জ্যোতির্বিদ্যা, আধুনিক বিজ্ঞান, বিভিন্ন রোগ ব্যাধি, বিখ্যাত আবিষ্কার ইত্যাদি। তথ্য প্রযুক্তিতে কম্পিউটার এবং মোবাইল এর ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার, প্রোগ্রাম ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ আবিষ্কারক ও সাল, বাংলাদেশ এর অবস্থা ইত্যাদি পড়া যেতে পারে।

প্রিলি এর জন্য যেকোনো একটি ডাইজেস্ট দিয়েই প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা যায়। তবে নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারেন্ট এফেয়ারস এর বিশেষ বিসিএস সংখ্যা, পূর্বের প্রশ্ন ইত্যাদি আপনাকে প্রকৃত চিত্র না দিলেও প্রচ্ছন্ন ধারণা অন্তত দিতে পারবে। নোট করে পড়ার প্রয়োজন নেই, তবে মনে রাখার জন্য শর্ট টেকনিক, টোটকা এসব যেখানে পাওয়া যাবে শিখে নেয়া ভাল। প্রিলিতে আপনাকে এক গাদা তথ্য নিয়ে পরীক্ষার হল এ যেতে হবে। বারবার অনুশীলন করলে আপনি কোথায় কোন তথ্য তা মন রাখতে পারবেন।

সামনে ৩৮তম বিসিএস এর বিজ্ঞপ্তি হবে। নিজের যে চাকুরীর প্রতি প্রবল ইচ্ছা আছে তা দিয়ে ক্যাডার পছন্দক্রম শুরু করুন। যদি আপনি বিসিএস এর মাধ্যমে শুধু একটি সরকারী চাকুরী খুঁজছেন এমন হয় তাহলে পছন্দক্রম অনুসারে সব গুলো ক্যাডার পছন্দের তালিকাতে দিন, নতুবা শুধুমাত্র পছন্দের ক্যাডার সমূহ তালিকাতে সংযোজন করুন। যে ক্যাডার এর প্রতি আপনার আগ্রহ নেই তা পছন্দের তালিকাতে দেয়ার যৌক্তিকতা নেই। এবং মনে রাখবেন আপনার প্রথম পছন্দ অনুযায়ী আপনাকে মৌখিক পরীক্ষাতে প্রশ্ন করা হবে। অতএব, আপনার সাধ এবং সামর্থ্য এর সম্মিলনে পছন্দের তালিকা তৈরি করুন।

প্রিলি এক্সাম এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সময় ব্যবস্থাপনা। অনেক সময় দেখা যায় যে, ভাল প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও অনেকে পরীক্ষার সময় সব প্রশ্নের উত্তর করে আসতে পারেন না, অনেকে জানা অনেক বিষয় পরীক্ষার চাপে ভুলে যান, ভুল করে বসেন,তাদের এইসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পরীক্ষার আগেই বাসায় বসে পরীক্ষার আদলে মডেল টেস্ট দিতে হবে। বিভিন্ন সেলফ টেস্ট প্রশ্ন পাওয়া যায়, তা দিয়ে পরিক্ষা দিলে পরীক্ষা বিষয়ে জড়তা কেটে যাবে, খুঁটিনাটি ভুলগুলোর সম্ভাবনা কমে যাবে।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on pocket
Pocket
Share on email
Email
Share on print
Print

Related Posts

সাম্প্রতিক খবর

Close Menu