কানাডায় পড়াশোনার সুযোগ

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন কার না থাকে। বিশেষ করে ইউরোপীয়ান দেশগুলোতে পড়াশোনার স্বপ্ন আছে অনেকেরই। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য না জানার কারণে এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রচুর শিক্ষার্থীদের কানাডায় পড়াশোনার সুযোগ দেয়া হয়। কন্তু বাংলাদেশ থেকে সে পরিমাণ শিক্ষার্থী কানাডায় যায় না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান থেকে প্রচুর পরিমান শিক্ষার্থী কানাডায় পড়াশোনার জন্য আসেন।

চলুন জেনে নেই যারা কানাডায় জন্য আসতেই চান, তারা কিভাবে সবচেয়ে ভাল প্রতিষ্ঠানে আসতে পারেন এবং পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারেন।

কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুইটি লেভেল রয়েছে :
১. আন্ডার গ্রাজুয়েট (ব্যাচেলর ডিগ্রি)।
২. পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট (মাষ্টারস এবং পি এইচ ডি)।

প্রতি বছর তিনটি সেমিস্টার রয়েছে :
১। ফল (সেপ্টেম্বর- ডিসেম্বর): এটাকেই একাডেমিক ইয়ার-এর (শিক্ষা বর্ষের) শুরু ধরা হয়। সাধারণত সব ছাত্র ছাত্রীকে এই সেমিস্টারে ভর্তি করা হয়। ভর্তির আবেদন-এর সময় বিশ্ববিদ্যালয় অনুসারে তাদের আলাদা করা হয়। সাধারণত আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেল জুন-এর দিকে এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেভেল মার্চ-এপ্রিল-এর দিকে। উল্লেখ্য, ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই ভাল।

২। উইন্টার (জানুয়ারী-এপ্রিল): আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেল-এ অনেকেই উইন্টারে ছাত্র ছাত্রী ভর্তি করে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে এই সেমিস্টারে খুব বেশি নতুন শিক্ষার্থী নেয়া হয় না। তারপরেও চেষ্টা করতে পারেন। ভর্তির শেষ সময় অাগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর-এর মধ্যে।

৩। সামার (মে- অাগষ্ট): এই সময় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ছুটি থাকে। বিশেষ করে যারা আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেল-এ পড়ে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটদের গবেষণা অথবা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। উল্লেখ্য বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী যারা এখানে বাংলাদেশ থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেভেল-এ পড়তে আসে, তারা রিসার্চ ফান্ড থেকে সাহায্য পায়- বিনিময়ে সয়শ্লিষ্ট প্রফেসর ইচ্ছামত খাটিয়ে নেন।

শিক্ষাগত মান :

কানাডার শিক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এদের মান প্রায় সমান। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি কিন্তু স্বায়ত্ব শাসিত। যে বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রোগ্রাম অফার করে, তার ভাল অবকাঠামো আছে। তাই কানাডার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-এর র‌্যাকিং নিয়ে অনেকের দ্বিমত, ত্রিমত আছে।

এখানে বেশির ভাগ প্রোগ্রাম সেন্ট্রাল-লি কন্ট্রোল করা হয়- বোর্ড এর মাধ্যমে। প্রকৌশল বিভাগ প্রত্যেক প্রভিন্স-এ (প্রভিন্স গুলো ইউ এস এ-র স্টেট-এর মত স্বায়ত্ব শাসিত) একটি বোর্ড দিয়ে কন্ট্রোল করা হয়।

থাকা খাওয়ার খরচ :

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকতে হলে ডর্মে (বাংলাদেশে হল-এর অনুরূপ) থাকতে হবে। খরচ হবে প্রতি চার মাসে ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ ডলার পর্যন্ত- সুযোগ সুবিধার উপর ভিত্তি করে। খাওয়ার খরচ মিল প্লান-এ আলাদা ভাবে কিনতে হবে- ডর্মে থাকলে সেটা সাধারণত বাধ্যতামূলক। ডর্মে থাকা বাঙ্গালি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল খাওয়া। মোদ্দা কথা ডর্মে থাকা অনেক ব্যয়বহুল- কিন্তু ঝামেলামুক্ত।

যারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন তাদের খরচ একজনের জন্য এরকম হয় :
১। বাসা ভাড়া: ২৫০- ৮০০ ডলার (শেয়ার করে থাকলে কম খরচ)
২। যোগাযোগ: বাস পাস (৬০$-১৫০$) অনেক প্রভিন্স-এ শিক্ষার্থীদের বাস পাস ফ্রি। (যেমন আলবার্টা)
৩। খাওয়া: বাসায় রান্না করলে ১০০-২০০$; বাইরে খেলে: ৩০০-৬০০$ ৪।

ফোন এবং ইন্টারনেট: শেয়ার করলে খরচ অনেক কমে যায়। কমপক্ষে ৫০-১০০$ ধরে রাখুন।

উল্লেখ্য : শহর থেকে শহর-এ আলাদা হতে পারে। আপনার থাকার উপর-ও নির্ভর করে। উপরের খরচ একজনের মোটামুটি থাকার মত খরচ।

পড়ালেখার খরচ :

প্রতি একাডেমিক ইয়ার-এ বিশ্ববিদ্যালয় ফি বাবদ খরচ প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২৮,০০০ কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত। ইমিগ্রেন্ট বা সিটিজেনদের জন্য এ খরচ ৪,০০০ থেকে ৭,৫০০ ডলার পর্যন্ত। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার আরো অনেক কম বেতন (৮-১৪ হাজার ডলার)।

সাধারণত এসব বিশ্ববিদ্যালয় একটু ছোট শহরে অবস্থিত হয়। তাই ক্যারিয়ারের দিকে সুবিধা কম থাকে। কিন্তু ভাল দিক হল খরচ অনেক কমে যায়।

স্কলারশিপে পড়াশোনা :

আন্ডারগ্র্যাজুয়েটদের জন্য কানাডায় খুব বেশি সুবিধা নেই। অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এই লেভেল-এ স্কলারশিপ দেয়; যা মূল খরচের চেয়ে অনেক কম। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, যারা বেশী বেতন রাখে তারা স্কলারশিপ দিয়ে রেগুলার বেতনের সমান করে দেয়ার মত সৌজন্য দেখায়। ভাল রেজাল্ট করলে ছোট খাট কিছু স্কলারশিপ পাওয়া যায়। একাধিক স্কলারশিপ পেলে চাপ অনেক কমে যায়- যা পাওয়া অনেক কঠিন। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিসিতে বলাই থাকে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রী হওয়ার কারণে আপনি কোন স্কলারশিপ পেতে পারবেন না। এটা চেক করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিকল্প উপায়ে পড়াশোনা :

কানাডায় কিছু প্রোগ্রামে কো-ওপ নামে একটি অপশন অফার করে। এটি অনেকটা ইন্টার্নশিপের মত। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো আপনার টাকা পে করে।তবে কো-অপ-এ ঢুকতে হলে অনেক ভাল সিজিপিএ লাগে। একটি অতিরিক্ত কোর্স এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় ফি বাবদ- তবে যা আসে তা অনেক সাহায্য করে।

এ ছাড়াও অফ ক্যাম্পাস ওয়ার্ক পারমিট-এর সুবিধা আছে। এই সুবিধা পেতে অবশ্য প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। ৬ মাস ফুল টাইম পড়া শুনার পরে আপনি এপ্লাই করতে পারবেন, কিন্তু কাগজ যোগাড় করতে সময় লাগায় মোট ৭-৮ মাস লেগে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশকে সন্দেহজনক দেশের তালিকায় যুক্ত করায় প্রসেসিং সময় ১৫ দিনের বদলে কমপক্ষে ৩ মাস লাগে।

সব মিলিয়ে প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হবে কাজ করার পারমিশনের জন্য। এর আগে ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করা অবৈধ। তার আগে এবং পরে অন ক্যাম্পাসে ২০ ঘন্টা কাজ করতে পারেন- যা পাওয়ার সম্ভাবনা শুরুর দিকে খুবই ক্ষীণ।তবে অফ/অন ক্যাম্পাস কাজ করে থাকা খাওয়ার খরচ তোলা সম্ভব।

পোস্টগ্র্যাজুয়েট :

এই লেভেলে প্রচুর সুযোগ সুবিধা রয়েছে। সাধারণত এই লেভেলে আসা সব ছাত্র ছাত্রী স্কলারশিপ এবং বিভিন্ন ফান্ডিংয়ে আসেন। টিএ (টিচিং এসিস্টেন্ট- ছাত্র ছাত্রীদের বিশেষ করে আন্ডার গ্রাড-দের সাহায্য করা), আর এ (রিসার্চ এসিস্টেন্ট- গবেষণায় সাহাযয় করা) এবং বৃত্তির টাকা মিলে সাধারণত যে টাকা অফার করে তাতে একা হলে নিজের টুইশন ফি, থাকা খরচ-এর পরেও বাসায় টাকা পাঠাতে পারবেন।

তবে ভর্তি অনেক প্রতিযোগিতামূলক। শর্ত একটাই, এভারেজ সাধারণত এ- রাখতে হবে। এর চেয়ে কমে গেলে বেতন আবার পুরোটা দিতে হবে আপনাকে। তাই এই কথাটি মাথায় রেখে মন দিয়ে পড়লে আশা করি কোন সমস্যা হবেনা। আর যারা সামর্থ রাখেন খরচ করার কিন্ত রেজাল্ট ভাল নেই তারা নিজ খরচে আসতে পারেন।

ভর্তি হবেন যেভাবে :

বাংলাদেশের এজেন্ট আর দালালদের দৌরাত্মে হয়তো ভয় পেতে পারেন। বাংলাদেশ থেকে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেলে ডাইরেক্ট এপ্লাই করা একটু কষ্টসাধ্য। তবে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড থাকলে কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। নিচে কিছু লিংক দেয়া আছে যেগুলো আপনাকে অনেক সাহায্য করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ওয়েব সাইটে গেলেই দেখবেন শুরুর পেইজে “প্রোস্পেক্টিভ স্টুডেন্ট” অথবা “ফিউচার স্টুডেন্ট” নামে একটি লিংক আছে। মোটামুটি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইটে এটি একই। এখানে ক্লিক করলে জানতে চাইবে আপনি কোন লেভেল-এ আগ্রহী। এখন নিশ্চয়ই জেনে গেছেন কোন লেভেল। সেখানে প্রয়োজনীয় সব তথ্য, যোগ্যতা, আবেদন পত্র পাবেন।

দুইভাবে আবেদন করা যায় :
১. কাগজের মাধ্যমে।
২. অনলাইনে সরাসরি।

কাগজের মাধ্যমে আবেদন করার ফরম অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে প্রিন্ট আউট করতে পারেন। ব্যাংক ড্রাফট করতে একটু ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। হয়তো এটাই হবে আপনার প্রথম বাধা।

অনলাইনে এপ্লাই করার সময় মনে রাখবেন- এটা সিরিয়াস ব্যাপার। আবেদনপত্র শেষ হওয়ার পরে প্রয়োজনীয় ফি না দিলে এটা কোন কাজে আসবেনা। এবং আবেদন করার আগে শিওর হয়ে নিবেন সেটা ঠিক সাইট। অনেক ভুয়া সাইটে প্রতারিত হতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অবশ্যই খবর নেবেন।

ওয়েবসাইটে ওই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলা সব কথা বিশ্বাস করবেন না। অনেকে অদ্ভুত কিছু র‌্যাকিংয়ে নিজেদের ভাল অবস্থান দাবি করে। তাতে খুব একটা পাত্তা দেবেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় চয়েজের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন :
১। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম আপনি আগে কারো কাছ থেকে শুনেছেন কিনা। শুনে থাকলে কি শুনেছেন।

২। আপনি যে বিষয়ে আগ্রহী সেই বিষয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা সাইট আছে। সেখানে যান। তাদের ফ্যাকাল্টিদের প্রোফাইল দেখুন। কি কি রিসার্চ করে তা দেখুন।

৩। আপনার আগ্রহের প্রোগ্রামে কি কি ফেসিলিটি আছে তা দেখুন। ওই বিষয়ে তাদের কোন সাম্প্রতিক সাফল্য দাবি করার মত কিছু আছে কিনা দেখুন। থাকলে তা যাচাই করুন।

৪। বিশ্ববিদ্যালয়টি স্কলারশিপ প্রদানে কতটা উদার খবর নিন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটড লেভেলে হলে ডিপার্টমেন্টের উপরের দিকে কারো (চেয়ার, ডিন, এসোসিয়েট ডিন অথবা আপনার গবেষণার বিষয়ের সাথে মিলে এমন কোন অধ্যাপক-এর সাথে যোগাযোগ করুন এপ্লাই করার আগে।

৫। বিশ্ববিদ্যালয়টি যেই শহরে অবস্থিত তা সম্পর্কে জানুন। সেখানে কি কি ইন্ডাস্ট্রি আছে- সেসব জায়গায় আপনার বিষয়ের চাহিদা কেমন। দিন শেষে লোকালদের প্রাধান্য সবাই দেয়।

৬। থাকার সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে খবর নিন। এসব খবর সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অফিসে পাওয়া যায়। (আই এস ও নামে সাধারণত পরিচিত) পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেভেলে কোথাও কোথাও আপনাকে বলবে আসার পরে একটা পরীক্ষা দিতে- কোন মডিউলে পাস না করলে কিছু আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্স নিতে বলবে।

প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটের এড্রেস :

১। http://www.ouac.on.ca/ – এটি অন্টারিওর বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তির অনলাইন সাইট। এটার মাধ্যমে এপ্লাই করতে পারেন অথবা সরাসরি এপ্লাই করতে পারেন। এটা নির্ভরযোগ্য। খরচ একটু বেশী- কিন্তু টাকা কোথায় ঢাললেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবেনা এবং অনলাইনে আপনার ভর্তির স্ট্যাটাস চেক করতে পারবেন। এপ্লাই করার পর এই সাইট নিয়মিত চেক করা উচিত। অবশ্যই সঠিক ফরম পূরণ করবেন।

২। http://cic.gc.ca/english/study/index.asp – এটি সরকারী সাইট এখানে স্টাডি পারমিট এবোং পড়াশুনা বিষয়ক সব ধরণের ফর্ম এবং সরকারী সিদ্ধান্ত জানতে পারবেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on pocket

এরকম আরও নিউজ