কলেজ শিক্ষকদের দখলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর!

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৩০টি কর্মকর্তা পদের মধ্যে ৪৫টি দখল করে আছেন কলেজশিক্ষকরা। সংযুক্ত থাকা এই শিক্ষকদের কারণে নিজস্ব জনবল নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে পারছে না প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকা শিক্ষকদের আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়ে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিবকে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। তারা সংযুক্ত শিক্ষকদের ফেরত পাঠানোর নির্দেশনাসংবলিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির বাস্তবায়ন চায়।

প্রায় এক মাস আগে গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।

চিঠিতে বলা হয় “মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার আওতাধীন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্যদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য দপ্তর ও সংস্থায়, বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজে প্রেষণ/সংযুক্তি থাকা আদেশ বাতিলপূর্বক নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। সরকারি কলেজে সুষ্ঠু পাঠদানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অনুশাসন প্রদান করেছেন।”

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন খালিদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সংযুক্ত থাকা কর্মকর্তাদের তালিকা চাই। তারা সেটি পাঠিয়েছে।” মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান সচিব।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর ঢাকাটাইমসকে জানান, মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকা কর্মকর্তাদের (শিক্ষক) একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন তারা।

মহাপরিচালক আরও বলেন, “আমরা চাইলে তাদের আদেশ বাতিল করতে পারি না। এসব কর্মকর্তার আদেশ বাতিল করতে হলে তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে করতে হবে।”

তালিকা থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন বিষয়ের ৪৫ জন সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে সংযুক্ত রয়েছেন। অধিদপ্তরের উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, সহকারী প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে সংযুক্ত রয়েছেন তারা।

তবে বর্তমানে নতুন করে কোনো সংযুক্তি দেয়া হচ্ছে না বলে জানান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, “সংযুক্তির বিষয়ের কাজ করে থাকে মন্ত্রণালয়। প্রত্যাহারও করে তারাই। আমরা কেবল বাস্তবায়ন করি।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে কলেজশিক্ষকদের সংযুক্তির কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি ও অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অর্থ) মো. নবী হোসেন তালুকদার বলেন, “অনেকে আছেন, যে পদে যোগদান করেন, সে পদে থেকেই চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করতে হচ্ছে। নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো নিয়োগবিধি না থাকায় বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের স্থায়ী জনবলও চরম হতাশায় ভুগছে।”

নবী হোসেন তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, “প্রেষণে নিয়োজিত এসব কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব কর্মস্থল অর্থাৎ কলেজে অধ্যাপনা না করে স্থায়ীভাবে ঢাকায় অবস্থান এবং বৈদেশিক ভ্রমণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাকরি করছেন। এতে একদিকে সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষকদের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অপর দিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রায় ১ম ও ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা/শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পদোন্নতি থেকে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংযুক্ত থাকা শিক্ষকদের স্ব স্ব মূল কর্মস্থলে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেয়ার পরও মন্ত্রণালয় তা পালন করেনি।

অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের বিভিন্ন কলেজে অনেক শিক্ষক পদ শূন্য। অথচ এত এত শিক্ষককে সামঞ্জস্যহীন দায়িত্বে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন পদে সংযুক্ত থাকা কলেজশিক্ষকরা হলেন: মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ, উপপরিচালক (তদন্ত শৃংখলা/বই বিতরণ); মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। মজিবুর রহমান, সহকারী পরিচালক (আইন কোষ), মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। অংশু কুমার দেবনাথ, সহকারী পরিচালক (বই বিতরণ), অধ্যাপক (মৃত্তিকাবিজ্ঞান)। সাইফুল ইসলাম, উপপরিচালক; মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (ইসলামের ইতিহাস)। ড. আবুল কালাম আজাদ, সহকারী পরিচালক; মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। মোহাম্মদ আসলাম হোসেন, সহকারী পরিচালক, মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (বাংলা)। মো. আতাউর রহমান, সহকারী পরিচালক, তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (বাংলা)। ফজলে ছিদ্দীক মো. ইয়াহিয়া, উপপরিচালক; মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান)। সনিয়া আকবর, সহকারী পরিচালক; মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (দর্শন)।

উপপরিচালক পদে সংযুক্ত শাহনাজ পারভীনের মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (ইংরাজি)। বাদশা মিয়া সহকারী পরিচালক (প্রাক-প্রাথমিক) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (কৃষি)। মো. মোশরেকুল আলম আছেন সহকারী পরিচালক পদে; তার মূল পদ (পদার্থবিজ্ঞান)। সৈয়দা নুরজাহান, উপপরিচালক (সেকেন্ড চান্স এডুকেশন); তার মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (প্রাণীবিজ্ঞান)। সুবীর চৌধুরী, উপপরিচালক (সেকেন্ড চান্স এডুকেশন), তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (রসায়ন)। আব্দুল মান্নান, সহকারী প্রকল্প পরিচালক, দারিদ্র্য পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করছে, তার মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (সমাজকল্যাণ)। একই প্রকল্পে মাহমুদা খাতুন সহকারী প্রকল্প পরিচালক, তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (হিসাব বিজ্ঞান)। বেগম খালিদা ইয়াসমিন সহকারী প্রকল্প পরিচালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প (২য় পর্যায়ে); তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)। জেসমিন তাসমিন বানু সহকারী পরিচালক পদে রয়েছেন; তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (দর্শন)। নরুজ্জামান মল্লিক, সহকারী পরিচালক; তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। মো. সিদ্দিকুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক (ইংলিশ ইন অ্যাকশন) পদে রয়েছেন, তার মূল পদ সহযোগী অধ্যাপক (ব্যবস্থাপনা)। বেগম শামীমা সুলতানা, প্রকল্প পরিচালক, ইংলিশ ইন অ্যাকশন পদে দায়িত্ব পালন রয়েছেন; তার মূল পদ হলো (ভূগোল)। এস এম জাহিদুল হাসান সহকারী পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন, তার মূল পদ হলো সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। আহসান হাবীব সহকারী পরিচালক পদে সংযুক্ত, তার মূল পদ সহকারী অধ্যাপক (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on pocket

এরকম আরও নিউজ