অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির স্কলারশীপ!

কিভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলারশীপ পাওয়া যায়- সঠিক পরামর্শ চেয়ে গত কয়েক বছরে অনেক ইমেইল পেয়েছি। কাজের ফাঁকে চেষ্টা করেছি সবাইকেই যথাযত উত্তর দিতে।

Slider7_study_australia

গত পাঁচ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কলারশীপ কমিটিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমার কাজ ছিলো কাদেরকে স্কলারশীপ দেওয়া হবে, কাদেরকে দেওয়া হবেনা তার একটি মেরিট বেজড লিস্ট তৈরী করা। সেই লিস্টও ফাইনাল লিস্ট না। অনেক চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো।

অনেক যাচাইবাচাই করে স্কলারশীপের জন্য ফাইনাল লিস্ট করা হতো। তবে বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের সিভি, ট্রানসক্রিপ্ট, রিকমেন্ডেশান লেটার এগুলো পড়ে, দেখে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তাছাড়া আমার নিজের ল্যাবেও কিছু বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী নিয়োগ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর কিছু অংশ স্কলারশীপ প্রার্থী ছাত্রছাত্রীদের কাজে আসতে পারে।

পিএইচডির জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরী হলো অনার্স ও মাস্টার্সে ভালো রেজাল্ট। দুটিতেই সিজিপিএ ৩.৫ এর কাছাকাছি থাকলে চলবে। তবে অনার্স ও মাস্টার্সের থিসিস কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ পৃষ্ঠার হতে হবে (৮ থেকে ১২ হাজার শব্দের মাঝে)। মাস্টার্সের থিসিস থেকে ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে (যেটার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ২ বা তার উপর) কমপক্ষে একটি ভালো পাবলিকেশান থাকতে হবে।

ইদানিং একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশ থেকে অনেক ছেলেমেয়ে নামেমাত্র ইন্টারন্যাশনাল এমন জার্নালে পাবলিকেশান করছে। একবছরে ৭টা থেকে ১০টা পেপার পাবলিশ করেছে এমন অনেক সিভি আমি পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে জার্নালের কোন নামধাম কোথাও পাইনি।

আমি বলবো তোমরা এমন নামেমাত্র জার্নালে এতোগুলো পেপার পাবলিশ না করে ভালো একটি জার্নালে একটি বা দুটি পাবলিশ করো।

বাংলাদেশ থেকে যেহেতু ভালো পাবলিকেশানের তেমন সুযোগ নেই, তাই দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান বা তাইওয়ান থেকে একটা মাস্টার্স করে ফেলতে পারো। শুধু এই কয়টি দেশই না, বাংলাদেশের অনার্স এবং মাস্টার্সের ভালো রেজাল্ট দিয়ে আরো অনেকদেশেই মাস্টার্সের ভালো সুযোগ করে নেওয়া যায়। এই সুযোগে কয়েকটি ভালো পাবলিকেশান করে ফেলতে পারবে। আমি নিশ্চিত বিদেশী একটা মাস্টার্স থাকলে অস্ট্রেলিয়ার যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার পিএইচডির স্কলারশীপ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, অস্ট্রেলিয়াতে মাস্টার্সের স্কলারশীপের সুযোগ অনেক কম। আবার বাংলাদেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সকে অস্ট্রেলিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অনার্সের সমমানের মনে করেনা (আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও জানি যে এই দুটি অনার্সের মাঝে বিশাল পার্থক্য)।

আরেকটি ব্যাপার ইদানিং লক্ষ্য করেছি, অনেকেই নিজের টাকায় মাস্টার্স করতে অস্ট্রেলিয়াতে আসে। তাদের উদ্দেশ্য, পরে পিএইচডির স্কলারশীপ ম্যানেজ করে নিবে। এটা একটা ভালো মুভ। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই মাস্টার্সটা ‘মাস্টার্স বাই রিসার্চ’ না হলে স্কলারশীপ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। মাস্টার্স বাই রিসার্চের ক্ষেত্রে যেটা হয়, তোমাকে একটা হোস্টল্যাবের অধীনে থাকতে হবে।

তুমি যদি কোর্সওয়ার্কে ভালো রেজাল্ট করো এবং প্রজেক্ট অংশেও ভালো কাজ করো তাহলে তোমার হোস্টসুপারভাইজারের রিকমেন্ডেশানে তুমি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েই একটা ভালো স্কলারশীপ পেয়ে যাবে। না পেলে, তোমার সুপারভাইজার নিজেই একটা ফান্ডের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন (বা দেন)।

ইয়েস, অস্ট্রেলিয়াতে পড়াশুনার আরেকটি কন্ডিশান আইইএলটিএস। প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একটা নূন্যতম আইইএলটিএস স্কোর চায়। তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ৬ এর (প্রতিটি ব্যান্ডে) নিচে নেই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো আইইএলটিএস স্কোর দিয়ে তোমার কমিউনিকেশান স্কিল বোঝা যাবে না। তোমাকে অনেক বেশি কনফিডেন্ট হতে হবে। ইন্ডিয়ান ছেলে মেয়েরা তোমাদের চেয়ে অনেক কমস্কোর করেও ভালো কমিউনিকেশান করে – এর কারণ হলো তারা অনেক বেশি কনফিডেন্ট।

একটি অবজারভেশান – বাংলাদেশি বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে সিভি তৈরিতে খুবই কাঁচা। সিভিটা খুব ইনফরমেটিভ হতে হবে। যে ল্যাবে এপ্লাই করবে সে ল্যাবের সাথে তোমার বর্তমান বা ভবিষৎ কাজের মিল আছে কিনা, থাকলেও কিভাবে আছে – সিভিতে এই বিষয়টা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো। খুব মার্জিতভাবে তোমার সকল অভিজ্ঞতার কথা লিখবে। সিভিতে ক্লাসে তোমার অবস্থান (যেমন: প্রথম আউট অফ ৭৫ স্টুডেন্টস), অনার্স বা মাস্টার্সে তোমার প্রথম শ্রেণি আছে কি না, কোনও এওয়ার্ড পেয়েছ কি না, পাবলিকেশানের ফুল রেফারেনস এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বা সাইটেশান আছে কি না, কনফারেনসে অংশ নিয়েছ কি না (কোন লেভেলের কনফারেনস, ওয়েবসাইট এড্রেস), পোস্টার বা টক দিয়েছ কি না – এসব পরিস্কার করে লেখা ভালো। নিজের সিভি লেখার সময় অন্যেরটা দেখা ভালো কিন্তু কখনো অন্যেরটা কপি করে কিছু লিখবেনা (এই বছর আমার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে – বাংলাদেশি এক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রের সিভি কাকতালীয়ভাবে আমার কাছে এসেছে। এদের সিভি পড়ে আমার মাথায় হাত! করছে কি? তিনজনের সিভি প্রায় একইরকম- শুধু তাদের নাম আর রেফারেনস ছাড়া সবই অভিন্ন।)

আরেকটি অবজারভেশান –বাংলাদেশি অধ্যাপকেরা রেফারেনস লেটার দেন খুব ভয়াবহরকম বাজেভাবে। বাংলাদেশি অধ্যাপকদের দুটি প্রধান রেফারেনস স্টাইল আমি খুব সহজে ধরে ফেললাম। একটা স্টাইলে খুব কাঁচা ইংরেজিতে লেখা রেফারেনস লেটার দেখা যায়। এর কারণ (সম্ভবত) রেফারেনস লেটারগুলো তারা নিজেরা লিখেন না। লেখে সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীরা। মাননীয় অধ্যাপকগণ শুধু নিজের প্যাডে (বা ইমেইলে) এটা কাট এন্ড পেস্ট করেন।

রেফারেনসের দ্বিতীয় স্টাইলটি আরো ভয়াবহ-একইরকম বাক্য, একইরকম শব্দ। বোঝা যায়, মাননীয় অধ্যাপকগণ হয়তো বাংলাদেশের চেয়ারম্যানদের চারিত্রিক সনদের মতো রেফারেনস লেটারের টেমপ্লেট ব্যবহার করেন। শুধু নাম ভিন্ন – আর বাকী টেক্সট অভিন্ন। ছাত্রছাত্রীদের বলছি, স্কলারশীপপ্রাপ্তিতে (ডিসিশান মেকিং এ) রেফারেনস লেটার আসলে খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ একটা বিষয়। তাই রেফারেনস লেটার হতে হবে সুন্দর এবং শুদ্ধ ইংরেজিতে লেখা – তোমার অভিজ্ঞতার মার্জিত কিন্তু পরিপূর্ণ মুখপত্র। রেফারেনস লেটারে ক্লিয়ারলি বলতে হবে কোন বিষয়ে তুমি দুর্বল এবং কোথায় তোমার স্ট্রেন্থ। একইসাথে রেফারেনস লেটারেই বলতে হবে তোমার প্রস্তাবিত প্রজেক্টের সাথে তোমার অভিজ্ঞতা কিভাবে এলাইন্ড।

লেখক: তরুণ বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া
ইমেইল: m.shiddiky@griffith.edu.au